মুজিবকোটের বাদশা মিয়া চৌধুরী – কক্সটিভি

সুজন কান্তি পাল, কক্সটিভি
  • প্রকাশিত সময় : বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯

বাদশা মিয়া চৌধুরী, জন্ম গ্রহণ করেন উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের সম্ভান্ত এক জমিদার পরিবারে।ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, একজন খাঁটি বঙ্গবন্ধু প্রেমিক নির্ভেজাল আওয়ামীলীগার তিনি।১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সারাদেশ যখন উত্তাল, সেই ঢেউ এসে যখন পড়ে উখিয়ায়, তখন সেই তরুণ বয়সেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ভাষা অান্দোলনে। উখিয়ার রত্না পালং উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বের হওয়া রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে প্রথম মিছিলেই তিনি নেতৃত্ব দেন এবং উখিয়া থানা ঘেরাও করেন। তা অাজ এক অনবদ্য স্মৃতি। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন তখন বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে এ অঞ্চলে তিনি ৬ দফা কর্মসূচী প্রচার করেছিলেন। তখন তাঁকে এই এলাকায় হিন্দুর ছেলে বলে অনেকেই টিটকারিও মেরেছিলেন। কিন্তু মুজিব অন্ত: প্রাণ বাদশা মিয়া চৌধুরীকে কোন টিটকারিই সেদিন দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি চলেছিলেন তাঁর অাপন গতিতে। ‘৭০ নির্বাচনে কক্সবাজার জেলার অনেক বড় বড় নেতাই যখন অাওয়ামীলীগের বিপক্ষে অবস্থান নেন তখন বাদশা মিয়া চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর অাওয়ামীলীগের পক্ষে ছিলেন ধীর -স্থির। কোন ভয়-ভীতি তাঁকে এতটুকু টলাতে পারেনি। ‘৭১ মুক্তিযুদ্ধে তিনি একজন দক্ষ সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।যার কারণে পাক-হানাদার বাহিনী উখিয়ায় প্রবেশের সাথে সাথে তাঁর বাড়ীটিও জ্বালিয়ে দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরোপুরি রাজনীতিতে সময় দিতে থাকেন তিনি। হলদিয়া পালং ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা পালন করেন জনকের মতই।তাই এই ইউনিয়নের মানুষ তাঁকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন পরপর ৪বার। ‘৭৫- এর ১৫ অাগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর তিনিই এই অঞ্চলে প্রথম তার প্রতিবাদ করেন। একটি ভাঙা চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে মুজিবকোট পরিহিত বাদশা মিয়া চৌধুরী মরিচ্যা স্টেশনে প্রথম খুনী-ফারুক- রশীদ গংদের বিরুদ্ধে করতে থাকেন সেদিন জ্বালাময়ী বক্তৃতা।তখন বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অনেক আওয়ামীলীগার খুনীদের বশ্যতা স্বীকার করেন রাতারাতি। অার বাদশা মিয়া চৌধুরী অবস্থান নেন স্রোতের বিপরীতে।অাদর্শের পক্ষে। দাবী জানাতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচার। অাওয়ামীলীগের দীর্ঘ ২১ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী অান্দোলন পরিচালনা করেন অাওয়ামীলীগের গুটিকয়েক কর্মী ও ছাত্রলীগের কিছু কর্মী নিয়ে উখিয়ার রাজপথে। তিনি দল বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় অনেকবার হলদিয়ার চেয়াম্যান নির্বাচিত হন। তা স্বর্থেও অাপোষ করেননি জিয়া- এরশাদ-খালেদার প্রশাসন যন্ত্রের সাথে কখনো।
দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে অাসে। তখনো উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি তিনি। উখিয়া-টেকনাফ থেকে তখন এমপি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মো: অালী। ক্ষমতার বলয়ের খুব কাছা-কাছি ছিলেন তিনি। তার সুবাধে এলাকার বেশ উন্নয়ন ও তিনি করেছিলেন তখন।অনেক উন্নয়নের মধ্যে বর্তমান হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সটিও তাঁর হাতে গড়া। কমপ্লেক্সটি গড়ে উঠার পেছনে মন্ত্রণালয়ে তদবির চালাতে গিয়ে অনেক কষ্টও পোহাতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার বলয়ের এত কাছা-কাছি থাকা সত্বেও তিনি নিজের জন্য কী করেছেন! হাল অামলে সরকারীদলে নেতৃত্ব দেয়া কতিপয় বিলাসী জীবন-যাপনকারী ব্যক্তিরা একবার বাদশা মিয়ার বাড়ীটি দর্শন করে অাসলেই বুঝতে পারবেন। দলের দায়িত্ব পালল ও ক্ষমতার কাছা-কাছি থেকে এই একজন বাদশা মিয়া চৌধুরী সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেন নি কখনো।বরঞ্চ বাপ-দাদার দিয়ে যাওয়া সম্পদ বিক্রি করেছেন বার বার। তাইতো রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে অনেকেই যখন ওয়ান ইলেভেনে অাত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন, ঠিক তখনি বাদশা মিয়া চৌধুরী দিব্বি ঘুরে বেড়িয়েছেন মুজিবকোট পরে বুক চিতিয়ে। কিন্তু এই বাদশা মিয়া চৌধুরীর খবর অাজ কে রাখে? অাওয়ামীলীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় অাজ ১০ বছরের অধিক সময়। দলের রথী-মহারথীরা কেউ কী এই সুসময়ে খবর রেখেছিলেন তাঁর? তবু অাফসোস নেই বাদশা মিয়া চৌধুরীর। তাইতো তিনি এখনো কী গরম- কী বর্ষা- কী শীতে এখনো মুজিবকোটেই চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ১৫ অাগস্ট অাসলে বাইরে যখন অনেকে কাঙালিভোজের মাংস ভাগা-ভাগি নিয়ে প্রচন্ড যুদ্ধ করতে থাকেন, তখন বাদশা মিয়া চৌধুরী বাড়ীর এককোণে বসে বুকে বঙ্গবন্ধুর ছবিটি পরম মমতায় জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন নীরবে – নিভৃতে…যেনো জাতিরপিতার ছবি বুকে জড়িয়ে এখনো তাঁর অাদর্শকে খুঁজে বেড়ান…।

সংবাদটি আপনার ফেইসবুকে শেয়ার করুন...

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ :